আল বদর-রাজাকারদের প্রতি মুক্তিযোদ্ধারা

তোমাদের কি লজ্জা করে না?

যুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদার বাহিনীকে সহায়তা দিতে বাঙালিদের মধ্য থেকে গড়ে উঠেছিল রাজাকার ও আল বদর বাহিনী। যারা পুরো যুদ্ধের সময় পাকসেনাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করে গেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের একাদশ খণ্ডে ৬ নম্বর সেক্টরের কিছু বিষয় সন্নিবেশিত আছে। তার একটি হলো—আল বদর ও রাজাকার বাহিনীর প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের আহ্বান। এই নথি থেকে বোঝা যায় সে সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান।

মুক্তিযোদ্ধাদের ওই প্রচারপত্রটিতে বলা হয়েছে—‘সমগ্র বাঙালি জাতি আজ  মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ঘৃণ্য পশ্চিম পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন করে মুক্ত করতে হবে সোনার বাংলাদেশ। তোমাদের (আল বদর ও রাজাকার) চোখের 

সামনে তোমাদের ভাই, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করছে বিজাতীয় পাক সেনারা। বাঙালি মা-বোনদের ওপরে এই দস্যুরা করেছে পাশবিক নির্মম অত্যাচার। শহরে ও গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় স্তূপীকৃত হয়েছে বাঙালির মৃতদেহ। ভাইসব, বাঙালি হয়ে দেশের ও জাতির এই সংকটময় মুহূর্তে তোমরা যোগ দিয়েছো বাঙালির বিরুদ্ধে বিদেশি শোষক-শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে। শত্রুর পুতুল সেনা হয়ে নিজের জাতির এবং নিজের ভাইবোনদের ওপর নির্যাতন মুখ বুজে মেনে নিতে এবং এই অন্যায় কাজে শত্রুর সহায়তা করতে তোমাদের কি লজ্জা করে না?’

এতে আরও বলা হয়, ‘পাকসেনারা তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন বজায় রাখার জন্য তোমাদের বলির পাঁঠা বানিয়েছে। জীবনের বিনিময়ে তুমি তোমার আত্মীয়-স্বজন ও স্বদেশবাসীর কাছে পাবে ধিক্কার, অপমান ও লাঞ্ছনা। তোমরা আমাদের ভাই, আমাদের জাতীর স্বার্থ অভিন্ন। স্বেচ্ছায় তোমাদের অনেকেই হয়তো রাজাকার বা আল বদর হয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করোনি। অবস্থার চাপে পড়েই হয়তো করতে হয়েছে। তোমাদের কাছে একান্ত অনুরোধ—তোমরা শত্রুর চক্রান্ত বানচাল করে দাও। তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে নিয়ে নির্ভয়ে মুক্তিবাহিনীর নিকটস্থ শিবিরে চলে এসো। এ পর্যন্ত রাজাকার ও বদর বাহিনীর বহু বাঙালি যুবক মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তারা প্রত্যেকে পেয়েছে ক্ষমা এবং তাদের অনেকে আজ মুক্তিবাহিনীর বীর

সৈনিক। তোমরাও মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের ও জনসাধারণের সেবা করে তোমাদের জীবন ধন্য করো। প্রতি সপ্তাহে দুই শতাধিক রাজাকার ও বদর সমর্থক প্রাণ হারাচ্ছে মুক্তিফৌজের হাতে, শুধু এই রণাঙ্গনে। পেশাদার ঝানু দালালদের আমরা ক্ষমা করি না। কিন্তু অনেক বাঙালি যুবক অবস্থার চাপে পড়ে বা ভুলবশত শত্রুর চক্রান্তে পড়ে রাজাকার ও বদর দলে যোগ দিয়েছে। তারা আমাদের কাছে চলে এলে পাবে ক্ষমা, বিশ্বাস, উপযুক্ত সম্মান ও স্নেহ। জয় আমাদের অনিবার্য।’

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচারপত্রে উল্লেখ করা হয়—‘বাংলাদেশের সব জনসাধারণ, সব দেশপ্রেমিক ও সব চিন্তাশীল নাগরিক আমাদের পক্ষে। বিশ্বের সব সৎ ও ন্যায়বান মানুষ আমাদের পক্ষে। কারণ, আমাদের সংগ্রাম ন্যায়ের সংগ্রাম, মুক্তি সংগ্রাম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতিতের সংগ্রাম। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালা ন্যায়ের সংগ্রামে আমাদের সহায়ক। লাখ লাখ  শহীদের শক্তি আমাদের সহায়ক। ইনশাআল্লাহ, বাঙালি জাতি অচিরেই গৌরবের অধিকারী হবে।’

শুরু থেকেই এ ধরনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। তারপরও হাজারে হাজারে মানুষ সামান্য কিছু লোভে নিজেদের সম্মান বিকিয়ে দিয়ে নিজেদের মানুষদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, শত্রুদের রাস্তা চিনিয়ে দিয়েছে।

ডিসেম্বর, বিজয় সন্নিকটে

এদিন বিকালে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে বীর মুক্তিযোদ্ধা, মিত্রবাহিনী ও জনতার উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তৎকালীন পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান জহুর আহমেদ চৌধুরী দলীয় পতাকা এবং মুক্ত কুমিল্লার প্রথম প্রশাসক অ্যাডভোকেট আহমদ আলী বাংলাদেশের সোনালি মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত হওয়ার পর সর্বত্র ওড়ানো হয়েছে বাংলাদেশের পতাকা, বইতে শুরু করেছে বিজয়ের আনন্দ।

৮ ডিসেম্বর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পতন হয় পাকবাহিনীর। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর তথা বৃহত্তর কুমিল্লা মুক্ত হয়। কুমিল্লা বিমানবন্দরে হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবস্থানের ওপর মুক্তিসেনারা আর্টিলারি আক্রমণ চালিয়ে শেষ রাতের দিকে তাদের আত্মসমর্পণ করাতে

সক্ষম হন। রাতব্যাপী প্রচণ্ড যুদ্ধে ২৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। হানাদার বাহিনীর কতিপয় সেনা বিমানবন্দরের ঘাঁটি ত্যাগ করে শেষ রাতে বরুড়ার দিকে এবং সেনানিবাসে ফিরে যায়। কুমিল্লা বিমানবন্দরের ঘাঁটিতে ধরা পড়া কতিপয় পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *