কবরের আজাব থেকে মুক্তি লাভ করার ৭টি বিশেষ আমল

আল্লামা সাফারি রহ. বলেন, কেউ যদি কবরের আযাব হতে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রত্যাশা রাখে সে যেনো নিন্মে আমলগুলো পালন করে : যখন রাত্রিবেলায় ঘুমানোর প্রস্ত্ততি নিবে তখন কিছু সময়ের জন্যে বিছানায় বসে মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করবে যে, সকাল থেকে এ সময় পর্যমত্ম পরকালের বাণিজ্যে কী পরিমাণ লাভ করেছে? এবং কী পরিমাণ ক্ষতি সাধন করেছে? এরপর আমত্মরিকতার সঙ্গে সকল প্রকার গুনাহ হতে তওবা করবে। ইসতেগফার করবে এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করবে, আগামীকাল থেকে আর আল্লাহর নাফরমানি করবো না। কালিমা তায়্যিবা ও ইসতিগফার পড়তে পড়তে শোবে। যদি এ রাতেই তার মৃত্যু ঘটে তাহলে তওবার ওপরই তার মৃত্যু হলো। আর যদি সকাল বেলা জাগ্রত হয় তাহলে নতুন করে সৎকাজ করার প্রেরণা বুকে নিয়ে জীবনটাকে নতুন করে শুরু করবে। হাদিসে বর্ণিত দুআ ও যিকর বেশি বেশি পাঠ করবে। [এর জন্যে হিসনে

হাসিন দ্রষ্টব্য]।

মানুষ যখন রাতে ঘুমাতে যায় তখন কিরামান কাতিবিন [আমল লিপিবদ্ধকারী দুই ফিরিশতা] আমল লেখার কাজ বন্ধ করে দেন। কাজেই তওবাহ ও ইসতিগফার পড়ে ঘুমালে একটি সুমহান কাজের ওপর লেখার পরিসমাপ্তি ঘটে। এরপর প্রত্যুষে যখন জাগ্রত হবে তখন আল্লাহর নাম নিয়ে জেগে উঠবে। তাহলে শয়ন ও জাগরণ উভয়টি আল্লাহর নামের ওপর হবে।

১. সুরা মুলক (তাবারাকাল্লাযি) তিলাওয়াত করা : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে এ সুরা তিলাওয়াত করবে সে কবরের আযাব হতে নিরাপদে থাকবে।  নবিজির যুগে সাহাবায়ে কেরাম এ সুরাকে মানিআহ [প্রতিহতকারী], মুনজিয়াহ [মুক্তিদাতা] এবং মুজাদিলাহ [স্বপক্ষে বিবাদকারী] প্রভৃতি নামে ভূষিত করতেন। কেননা সুরাটি তার তিলাওয়াতকারীকে কবরের আযাব হতে সুরক্ষিত রাখবে এবং তার জন্যে প্রয়োজনে

আল্লাহর সঙ্গে নাছোড় বিবাদে অবতরণ করবে। একাধিক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সা. তার ফযিলত সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। [শরহুস সুদুর : ১২৪]

২. সুরা আলিফ-লাম তানযিল সেজদা তিলাওয়াত করা : প্রখ্যাত তাবেয়ি হযরত খালিদ ইবনে মাদান বলেন, সুরা তাবারাকাল্লাযির মতো সুরা আলিফ-লাম-তানযিল সাজদাও আল্লাহ রাববুল আলামিনের কাছে তার তিলাওয়াতকারীর জন্যে কবরের আযাব মাফ আবশ্যক করতে বিবাদে লিপ্ত হবে। সে বলবে, হে আল্লাহ, আমি যদি তোমার কুরআনের একটি সুরা হয়ে থাকি তাহলে এ ব্যক্তির জন্যে আমার সুপারিশ কবুল করো। আর যদি আমি কুরআনের সুরা না হয়ে থাকি তাহলে  আমাকে কুরআন থেকে মুছে দাও।বর্ণিত আছে, হযরত খালিদ ইবনে মাদান রহ. কখনোই এ দুই সুরা পাঠ না করে রাতে ঘুমুতে যেতেন না।তিরমিযি ও দারেমি শরিফে হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. হতে বর্ণিত আছে, হুযুরে আকরাম সা. এই দুই সুরা তিলাওয়াত না করে রাতে কখনোই শয়ন করতেন না। [শরহুস সুদুর :

প্রত্যহ ১০০ বার لاإلهإلااللهالملكالحقالمبين পাঠ করা : হযরত আলি রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যহ ১০০ বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল মালিকুল হাক্কুল মুবিন পাঠ করবে আল্লাহ তাআলা তার অভাব অনটন দূর করে দিবেন, তার কবরের ভীতি ও অন্ধকার দূর করে দিবেন এবং তার জন্যে জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিবেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতেও অনুরূপ বর্ণিত রয়েছে।

৪. প্রচন্ড গরমকালে রোযা রাখা ও রাতের অন্ধকারে দুই রাকাত নামায আদায় করা : ইমাম বাইহাকি রহ. শুআবুল ঈমান গ্রন্থে বর্ণনা করেন, হযরত আবু যর রাযি. লোকদেরকে সম্বোধন করে বলতেন, হে লোকসকল, আমি তোমারদের হিতাকাঙ্ক্ষী, আমি তোমাদের ওপর সহানুভূতিশীল, আমি তোমাদেরকে বলছি, তোমরা রাতের অন্ধকারে তাহাজ্জুদের নামায আদায় করো, তাহলে তা তোমাদের কবরের অন্ধকারে আলো হবে

তোমরা প্রখর তপ্ত উষ্ণ দিনে রোযা রাখো, তাহলে তা পুণরুত্থান দিবসে তোমাদের তৃঞ্চা নিবারণ করবে। আর তোমরা যতো পারো সদকা করো, তাহলে তা কষ্টের দিনে তোমাদের সকল কষ্ট লাঘব করবে। হে লোকসকল, আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী হয়ে, সহানুভূতিশীল হয়ে তোমাদেরকে এই হিতোপদেশ দিচ্ছি।

৫. মসজিদ আলোকিত করা ও সেখানকার পরিবেশ সুঘ্রাণে বিমোহিত রাখার ব্যবস্থা করা : কানযুল উম্মালে রয়েছে, একবার আমিরুল মুমিনিন হযরত আলি ইবনে আবি তালিব রা. রমযান মাসের প্রথম রাতে বের হলেন। তিনি দেখতে পেলেন, মসজিদের ভেতর আলো জ্বলছে এবং সে আলোয় কুরআনে কারিম তিলাওয়াত করা হচ্ছে। তখন তিনি দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর জন্যে দুআ করে বললেন, আল্লাহ আপনার কবরকে আলোয় আলোয় ভরে দিন যেভাবে আপনি তার ঘরকে আলোকিত করে সেখানে কুরআন

তিলাওয়াতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। হযরত উমর ফারুক রা. হতে বর্ণিত আছে, হুযুর আকরাম সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মসজিদ আলোকিত করবে আল্লাহ তাআলা তার কবর আলোকিত করবেন। আর যে ব্যক্তি তার ঘরকে সুঘ্রাণে বিমোহিত করবে আল্লাহও তার কবরকে সুঘ্রাণে মাতিয়ে দেবেন। [শরহুস সুদুর]

৬. কুরআনে কারিম : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস ও হযরত ইকরামা রা. হতে বর্ণিত আছে, মুমিন ব্যক্তিকে তিলাওয়াত করার জন্যে কবরে কুরআনে কারিম দেয়া হবে। অপর এক হাদিসে হযরত রাসুলে আকরাম সা. ইরশাদ করেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি কুরআনে কারিম হিফয করা শুরু করেন আর হিফয শেষ করার পূর্বেই তার ইনতিকাল ঘটে তাহলে তার নিকট কবরে এক ফিরিশতা আসবেন এবং তাকে সেখানে কুরআনে কারিম হেফয করিয়ে দিবেন। [শরহুস সুদুর : ১২৮]ইলম ও কুতুবখানা  : দাইলামি রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. হতে বর্ণনা করেছেন, নবি করিম সা. ইরশাদ করেছেন, যখন কোনো আলেম ইনতিকাল করেন তখন আল্লাহ তাআলা তার ইলমকে একটি শারীরিক অবয়ব দেন এরপর সেটিকে সাজিয়ে তার কাছে রেখে দেন। সেটি কেয়ামত পর্যমত্ম তার জন্যে আনন্দদায়ক হবে এবং এ ইলম তাকে জমিনের পোকামাকড় হতে বাঁচিয়ে রাখবে। হাফেয আবুল আলা হামদানি রহ.কে মৃত্যুর পর স্বপ্নে দেখা গেলো যে, তিনি এমন এক নগরীতে বসবাস করছেন যে নগরীর দেয়ালে দেয়ালে শুধু কিতাব আর কিতাব। তখন স্বপ্নচারী লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করলো, এ অবস্থা কেনো? উত্তরে তিনি বললেন, আমি আল্লাহ তাআলার নিকট এ আবেদন রেখেছিলাম যে, তিনি যেনো এখানেও আমাকে

কিতাবের গভীরে ডুবে থাকার ব্যবস্থা করে দেন, যেমনটি আমি দুনিয়ায় থাকাকালে থাকতাম। আল্লাহ তাআলা আমার সে আবেদন মঞ্জুর করে আমার জন্যে এই কবরদেশে সে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

মূল : আল্লামা ইদরিস কান্ধলভি [রহ.] অনুবাদ : মাওলানা মিরাজ রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *